ফাতের

সুরার ভূমিকা

X close

নামকরণ

প্রথম আয়াতের فاطر শব্দটিকে এ সূরার শিরোনাম করা হয়েছে। এর মানে হচ্ছে, এটি সেই সূরা যার মধ্যে ‍‘ফাতের’ শব্দটি এসেছে। এর অন্য নাম الملائكة এবং এ শব্দটিও প্রথম আয়াতেই ব্যবহৃত হয়েছে।

নাযিলের সময়-কাল

ব্যক্তব্য প্রকাশের আভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য থেকে একথা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, সম্ভবত মক্কা মু’আযযমার মধ্য যুগে সূরাটি নাযিল হয়। এ যুগেরও এমন সময় সূরাটি নাযিল হয় যখন ঘোরতর বিরোধিতা শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং নবী (সা.) এর দাওয়াতকে ব্যর্থ করে দেবার জন্য সব রকমের অপকৌশল অবলম্বন করা হচ্ছিল।

বিষয়বস্তু ও মূল বক্তব্য

বক্তব্যের উদ্দেশ্য হচ্ছে, নবী করীম (সা.), এর তাওহীদের দাওয়াতের মোকাবিলায় সে সময় মক্কাবাসীরা ও তাদের সরদারবৃন্দ যে নীতি অবলম্বন করেছিল, উপদেশের ভংগীতে সে সম্পর্কে তাদেরকে সতর্ক ও তিরস্কার করা এবং শিক্ষকের ভংগীতে উপদেশ দেয়াও। বিষয়বস্তুর সংক্ষিপ্ত সার হচ্ছে, হে মূর্খেরা! এ নবী যে পথের দিকে তোমাদেরকে আহবান করছেন তার মধ্যে রয়েছে তোমাদের নিজেদের কল্যাণ। তাঁর বিরুদ্ধে তোমাদের আক্রোশ, প্রতারণা ও ষড়যন্ত্র এবং তাঁকে ব্যর্থ করে দেবার জন্য তোমাদের সমস্ত ফন্দি-ফিকির আসলে তাঁর বিরুদ্ধে নয় বরং তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধেই চলে যাচ্ছে। তাঁর কথা না মানলে তোমরা নিজেদেরই ক্ষতি করবে, তাঁর কিছু ক্ষতি করতে পারবে না। তিনি তোমাদের যা কিছু বলছেন সে সম্পর্কে একটু চিন্তা করে দেখো তো, তার মধ্যে ভুল কোনটা? তিনি শিরকের প্রতিবাদ করছেন। তোমরা নিজেরাই একবার ভাল করে চোখ মেলে তাকাও। দেখো, দুনিয়ায় শিরকের কি কোন যুক্তিসংগত কারণ আছে? তিনি তাওহীদের দাওয়াত দিচ্ছেন। তোমরা নিজেরাই বুদ্ধি খাটিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে দেখো, সত্যিই কি পৃথিবী ও আকাশমণ্ডলীর স্রষ্টা আল্লাহ ছাড়া আর এমন কোন সত্তার অস্তিত্ব আছে যে আল্লাহর গুণাবলী ও ক্ষমতার অধিকারী? তিনি তোমাদেরকে বলছেন, এ দুনিয়ায় তোমরা দায়িত্বহীন নও বরং তোমাদের নিজেদের আল্লাহর সামনে নিজেদের কাজের হিসেব দিতে হবে এবং এ দুনিয়ার জীবনের পরে আর একটি জীবন আছে যেখানে প্রত্যেককে তার কৃতকর্মের ফল ভোগ করতে হবে। তোমরা নিজেরাই চিন্তা করো, এ সম্পর্কে তোমাদের সন্দেহ ও বিস্ময় কতটা ভিত্তিহীন। তোমাদের চোখ কি প্রতিদিন সৃষ্টির পুনরাবৃত্তি প্রত্যক্ষ করছে না? তাহলে যে আল্লাহ এক বিন্দু শুক্র থেকে তোমাদের সৃষ্টি করেছেন তাঁর জন্য তোমাদেরকে পুনরায় সৃষ্টি করা আবার অসম্ভব হবে কেন? ভালো ও মন্দের ফল সমান হওয়া উচিত নয়, তোমাদের বুদ্ধিবৃত্তি কি একথার সাক্ষ্য দেয় না? তাহলে তোমরাই বলো যুক্তিসংগত কথা কোনটি--- ভালো ও মন্দের পরিণাম সমান হোক? অর্থাৎ সবাই মাটিতে মিশে শেষ হয়ে যাক? অথবা ভালো লোক ভালো পরিণাম লাভ করুক এবং মন্দ লোক লাভ করুক তার মন্দ প্রতিফল? এখন তোমরা যদি এ পুরোপুরি যুক্তিসংগত ও সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত কথাগুলো না মানো এবং মিথ্যা খোদাদের বন্দেগী পরিহার না করো উপরন্তু নিজেদেরকে অদায়িত্বশীল মনে করে লাগাম ছাড়া উটের মতো দুনিয়ার বুকে বেঁচে থাকতে চাও, তাহলে এতে নবীর ক্ষতি কি? সর্বনাশ তো তোমাদেরই হবে। নবীর দায়িত্ব ছিল কেবলমাত্র বুঝানো এবং তিনি সে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বক্তব্যের ধারাবাহিক বর্ণনায় নবী করীম (সা.) কে বারবার এ মর্মে সান্ত্বনা দেয়া হয়েছে যে, আপনি যখন উপদেশ দেবার দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করছেন তখন গোমরাহির ওপর অবিচল থাকতে যারা চাচ্ছে তাদের সঠিক পথে চলার আহবানে সাড়া না দেবার দায় আপনার ওপর বর্তাবে না। এই সাথে তাঁকে একথাও বুঝানো হয়েছে যে, যারা মানতে চায় না তাদের মনোভাব দেখে আপনি দুঃখ করবেন না এবং তাদের সঠিক পথে আনার চিন্তায় নিজেকে ধ্বংস করেও দেবেন না। এর পরিবর্তে যেসব লোক আপনার কথা শোনার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে তাদের প্রতি আপনার দৃষ্টি নিবদ্ধ করুন।

ঈমান আনায়নকারীদেরকেও এ প্রসংগে বিরাট সুসংবাদ দান করা হয়েছে। এভাবে তাদের মনোবল বাড়বে এবং তারা আল্লাহর প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থা স্থাপন করে সত্যের পথে অবিচল থাকবে।

اِنَّ الشَّيۡطٰنَ لَكُمۡ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوۡهُ عَدُوًّاؕ اِنَّمَا يَدۡعُوۡا حِزۡبَهٗ لِيَكُوۡنُوۡا مِنۡ اَصۡحٰبِ السَّعِيۡرِؕ‏
৬) আসলে শয়তান তোমাদের শত্রু, তাই তোমরাও তাকে নিজেদের শত্রুই মনে করো। সে তো নিজের অনুসারীদেরকে নিজের পথে এজন্য ডাকছে যাতে তারা দোজখীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
)
الَّذِيۡنَ كَفَرُوۡا لَهُمۡ عَذَابٌ شَدِيۡدٌ ؕ وَّالَّذِيۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوۡا الصّٰلِحٰتِ لَهُمۡ مَّغۡفِرَةٌ وَّاَجۡرٌ كَبِيۡرٌ‏
৭) যারা কুফরী করবে১৩ তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি আর যারা ঈমান আনবে এবং সৎকাজ করবে তাদের জন্য রয়েছে মাগফিরাত ও বড় পুরস্কার। ১৪
১৩) অর্থাৎ আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর রসূলের এ দাওয়াত মেনে নিতে অস্বীকার করবে।
১৪) অর্থাৎ তাদের ভুল-ভ্রান্তি ও অপরাধ মাফ করে দেবেন এবং তারা যেসব সৎকাজ করবে সেগুলোর কেবল সমান সমান প্রতিদান দেবেন না বরং বড় ও বিপুল প্রতিদান দেবেন।
اَفَمَنۡ زُيِّنَ لَهٗ سُوۡٓءُ عَمَلِهٖ فَرَاٰهُ حَسَنًاؕ فَاِنَّ اللّٰهَ يُضِلُّ مَنۡ يَّشَآءُ وَيَهۡدِىۡ مَنۡ يَّشَآءُ‌ۖ فَلَا تَذۡهَبۡ نَفۡسُكَ عَلَيۡهِمۡ حَسَرٰتٍؕ اِنَّ اللّٰهَ عَلِيۡمٌۢ بِمَا يَصۡنَعُوۡنَ
৮) (এমন১৫ ব্যক্তির বিভ্রান্তির কোন শেষ আছে কি) যার জন্য তার খারাপ কাজকে শোভন করে দেয়া হয়েছে এবং সে তাকে ভালো মনে করছে?১৬ আসলে আল্লাহ‌ যাকে ইচ্ছা বিভ্রান্তিতে লিপ্ত করেন এবং যাকে চান সঠিক পথ দেখিয়ে দেন। কাজেই (হে নবী!) অযথা ওদের জন্য দুঃখে ও শোকে তুমি প্রাণপাত করো না।১৭ ওরা যা কিছু করছে আল্লাহ‌ তা ভালোভাবে জানেন।১৮
১৫) ওপরের দু’টি প্যারাগ্রাফ সাধারণ জনগণকে সম্বোধন করে বলা হয়েছিল। এখন এ প্যারাগ্রাফে যেসব বিভ্রান্তির নায়করা নবী করীম ﷺ এর দাওয়াতকে ব্যর্থ করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল তাদের কথা বলা হচ্ছে।
১৬) অর্থাৎ এমন এক ধরনের বিভ্রান্ত ও দুস্কৃতকারী লোক আছে যে খারাপ কাজ করে ঠিকই কিন্তু সে জানে এবং স্বীকার করে যে সে যা কিছু করছে খারাপই করছে। এ ধরনের লোককে বুঝালেও ঠিক হয়ে যেতে পারে এবং কখনো নিজের বিবেকের তাড়নায়ও সে সঠিক পথে চলে আসতে পারে। কারণ তার শুধুমাত্র অভ্যাসই বিগড়েছে, মন-মানসিকতা বিগড়ে যায়নি। কিন্তু আর এক ধরনের দুস্কৃতকারী আছে, যার মন-মানসিকতাই বিগড়ে গেছে। তার ভালো-মন্দের পার্থক্যবোধই খতম হয়ে গেছে। গোনাহের জীবন তার কাছে প্রিয় ও গৌরবময়। সৎকাজকে সে ঘৃনা করে এবং অসৎকাজকে যথার্থ সভ্যতা ও সংস্কৃতি মনে করে। সৎবৃত্তি ও তাকওয়াকে সে প্রাচীনত্ব এবং আল্লাহর হুকুম অমান্য করা ও অশ্লীল কাজ করাকে প্রগতিশীলতা মনে করে। তার দৃষ্টিতে হিদায়াত গোমরাহীতে এবং গোমরাহ হিদায়াতে পরিণত হয়। এ ধরনের লোকের ওপর কোন উপদেশ কার্যকর হয় না। সে নিজের নির্বুদ্ধিতার ওপর নিজেই সতর্ক হয় না এবং কেউ তাকে বোঝালেও বোঝে না। এ ধরনের লোকের পেছনে লেগে থাকা অর্থহীন। তাকে সৎপথে আনার চিন্তায় প্রাণপাত না করে সত্যের আহবায়ককে এমন সব লোকের প্রতি দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন যাদের বিবেক এখনো বেঁচে আছে এবং যারা সত্যের আহবানের জন্য নিজেদের মনের দুয়ার বন্ধ করে দেয়নি।
১৭) আগের বাক্য এবং এ বাক্যের মাঝখানে “আল্লাহ‌ যাকে চান গোমরাহীতে লিপ্ত করেন এবং যাকে চান সঠিক পথ দেখান”--একথা বলা পরিষ্কারভাবে এ অর্থই প্রকাশ করছে যে, যারা এতদূর মানবিক বিকৃতির শিকার হয় আল্লাহ‌ তাদেরকে হিদায়াতের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেন এবং পথহারা হয়ে এমন সব পথে ঘুরে বেড়াবার জন্য তাদেরকে ছেড়ে দেন যেসব ভুল পথে ঘুরে বেড়ানোর জন্য তারা নিজেরাই জিদ ধরে। এ সত্যটি বুঝিয়ে দেবার পর মহান আল্লাহ‌ নবী করীম ﷺ কে বলেন এ ধরনের লোকদেরকে সঠিক পথে আনার সামর্থ্য তোমার নেই কাজেই তাদের ব্যাপারে সবর করো এবং আল্লাহ‌ যেমন তাদের পরোয়া করছেন না তেমনি তোমরাও তাদের অবস্থা দেখে দুঃখিত ও শোকাভিভূত হয়ো না।

এক্ষেত্রে দু’টি কথা ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে। এক, এখানে যাদের কথা বলা হচ্ছে তারা সাধারণ লোক ছিল না। তারা ছিল মক্কা মু’আযযমার সরদার। তারা নবী করীম ﷺ এর দাওয়াতকে ব্যর্থ করে দেবার জন্য সব রকমের মিথ্যা প্রতারণা ও ফন্দি-ফিকিরের আশ্রয় নিয়ে চলছিল। তারা আসলে নবী করীম ﷺ সম্পর্কে কোন ভুল ধারণা করতো না। তিনি কিসের দিকে দাওয়াত দিচ্ছেন এবং তাঁর মোকাবিলায় তারা নিজেরা কোন ধরনের মূর্খতা ও নৈতিক দুষ্কৃতির প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট রয়েছে তা তারা ভালোভাবে জানতো। এসব কিছু জানার ও বুঝার পর ঠাণ্ডা মাথায় তাদের সিদ্ধান্ত এই ছিল যে, মুহাম্মাদ ﷺ এর কথা চলতে দেয়া যাবে না। এ উদ্দেশ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট অস্ত্র এবং সবচেয়ে হীন হাতিয়ার ব্যবহার করতে তারা একটুও কুন্ঠিত ছিল না। এখন একথা সুস্পষ্ট, যারা জেনে বুঝে এবং নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে প্রতিদিন একটি নতুন মিথ্যা রচনা করে এবং কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে তা ছড়িয়ে বেড়ায় তারা সারা দুনিয়ার মানুষকে ধোঁকা দিতে পারে কিন্তু নিজেকে তো তারা মিথ্যুক বলে জানে এবং তাদের নিজেদের কাছে একথা গোপন থাকে না যে, যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে তারাএকটি অপবাদ দিয়েছে সে তা থেকে মুক্ত। তারপর যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে এ মিথ্যা হাতিয়ার ব্যবহার করা হচ্ছে সে যদি এর জবাবে কখনো সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে সরে গিয়ে কোন কথা না বলে তাহলে এ জালেমদের কাছেও একথা কখনো গোপন থাকতে পারে না যে, তাদের মোকাবিলায় যিনি দাঁড়িয়ে আছেন তিনি একজন সত্যবাদী ও নিখাদ পুরুষ। এরপরও নিজেদের কৃতকর্মের জন্য যারা এতটুকু লজ্জিত হয় না এবং অনবরত মিথ্যার মাধ্যমে সত্যের মোকাবিলা করে যেতে থাকে, তাদের এ নীতি নিজেই একথার সাক্ষ্য বহন করে যে, আল্লাহ‌র লানত তাদের ওপর পড়েছে এবং ভালোমন্দের কোন পার্থক্য বোধ তাদের মধ্যে নেই।

দ্বিতীয় যে কথাটি এ প্রসঙ্গে বুঝে নিতে হবে সেটি হচ্ছে এই যে, নিছক স্বীয় রসূল পাককে কাফেরদের প্রকৃত অবস্থা উপলব্ধি করানোই যদি আল্লাহর লক্ষ্য হতো, তাহলে তিনি গোপনে কেবলমাত্র তাঁকেই একথা বুঝাতে পারতেন। এ উদ্দেশ্যে প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে সুস্পষ্ট অহীর মাধ্যমে তার উল্লেখের প্রয়োজন ছিল না। কুরআন মজীদে একথা বর্ণনা করবার এবং সারা দুনিয়ার মানুষকে তা শুনিয়ে দেবার উদ্দেশ্যই ছিল আসলে সাধারণ মানুষকে এই মর্মে সতর্ক করে দেয়া যে, যেসব নেতার পেছনে তোমরা চোখ বন্ধ করে ছুটে চলছো তারা কতখানি বিকৃত মানসিকতা সম্পন্ন লোক এবং তাদের বেহুদা কাজকর্ম কেমন চিৎকার করে করে বলছে যে, তাদের ওপর আল্লাহর লানত পড়েছে।

১৮) আলোচ্য বাক্যটির মধ্যে এ স্বতস্ফূর্ত হুমকি প্রচ্ছন্ন রয়েছে যে, এমন একটি সময় আসবে যখন আল্লাহ‌ তাদেরকে এসব কৃতকর্মের শাস্তি দেবেন। কোন শাসক যখন কোন অপরাধী সম্পর্কে বলেন, তার কাজ কর্মের আমি সব খবর রাখি তখন তার অর্থ কেবল এতটুকুই হয় না যে, শাসক তার কাজকর্ম সব জানেন বরং তার মধ্যে এ সতর্কবাণীও নিহিত থাকে যে, আমি তাকে শাস্তি দেবোই।
وَاللّٰهُ الَّذِىۡۤ اَرۡسَلَ الرِّيٰحَ فَتُثِيۡرُ سَحَابًا فَسُقۡنٰهُ اِلٰى بَلَدٍ مَّيِّتٍ فَاَحۡيَيۡنَا بِهِ الۡاَرۡضَ بَعۡدَ مَوۡتِهَاؕ كَذٰلِكَ النُّشُوۡرُ‏
৯) আল্লাহই বায়ু প্রেরণ করেন তারপর তা মেঘমালা উঠায় এরপর আমি তাকে নিয়ে যাই একটি জনমানবহীন এলাকার দিকে এবং মৃত পতিত যমীনকে সঞ্জীবিত করে তুলি। মৃত মানুষদের বেঁচে ওঠাও তেমনি ধরনের হবে।১৯
১৯) অর্থাৎ এ মূর্খের দল আখেরাতকে অসম্ভব মনে করছে। তাই তারা নিজস্বভাবে এ চিন্তায় নিমগ্ন হয়েছে যে, দুনিয়ায় তারা যাই কিছু করতে থাকুক না কেন, তাদের জবাবদিহি করার জন্য আল্লাহর সামনে হাজির হবার সময়টি কখনো আসবে না। কিন্তু তারা যার মধ্যে নিমগ্ন আছে সেটি নিছক একটি খামখেয়ালি ছাড়া আর কিছুই নয়। কিয়ামতের দিন সামনের পেছনের সমস্ত মরা মানুষ মহান আল্লাহ‌র একটিমাত্র ইশারায় সহসা ঠিক তেমনিভাবে জীবিত হয়ে উঠবে যেমন একবার বৃষ্টি হবার পর শুকনো জমি অকস্মাৎ সবুজ শ্যামল হয়ে ওঠে এবং দীর্ঘকালের মৃত শিকড়গুলো সবুজ চারাগাছে রূপান্তরিত হয়ে মাটির বুক থেকে মাথা উঁচু করতে থাকে।
مَنۡ كَانَ يُرِيۡدُ الۡعِزَّةَ فَلِلّٰهِ الۡعِزَّةُ جَمِيۡعًاؕ اِلَيۡهِ يَصۡعَدُ الۡكَلِمُ الطَّيِّبُ وَالۡعَمَلُ الصَّالِحُ يَرۡفَعُهؕ وَالَّذِيۡنَ يَمۡكُرُوۡنَ السَّيِّاٰتِ لَهُمۡ عَذَابٌ شَدِيۡدٌؕ وَّمَكۡرُ اُولٰٓٮِٕكَ هُوَ يَبُوۡرُ‏
১০) যে সম্মান চায় তার জানা উচিত সমস্ত সম্মান একমাত্র আল্লাহরই।২০ তাঁর কাছে শুধুমাত্র পবিত্র কথাই ওপরের দিকে আরোহণ করে এবং সৎকাজ তাকে ওপরে ওঠায়।২১ আর যারা অনর্থক চালবাজী করে২২ তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি এবং তাদের চালবাজী নিজেই ধ্বংস হবে।
২০) মনে রাখতে হবে, কুরাইশ সরদাররা নবী করীম ﷺ কে মোকাবিলায় যা কিছু করছিল সবই ছিল তাদের নিজেদের ইজ্জত ও মর্যাদার খাতিরে। তাদের ধারণা ছিল, যদি মুহাম্মাদ ﷺ এর কথা গৃহীত হয়ে যায় তাহলে আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব তামাম আরব মুল্লুকে আমাদের যে মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত আছে তা মাটিতে মিশে যাবে। এরই প্রেক্ষিতে বলা হচ্ছে, আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও কুফরী করে তোমরা নিজেদের যে মর্যাদা তৈরি করে রেখেছো এ তো একটি মিথ্যা ও ঠুনকো মর্যাদা। মাটিতে মিশে যাওয়াই এর ভাগ্যের লিখন। আসল ও চিরস্থায়ী মর্যাদা, দুনিয়া থেকে নিয়ে আখেরাত পর্যন্ত যা কখনো হীনতা ও লাঞ্ছনার শিকার হতে পারে না, তা বেবলমাত্র আল্লাহর বন্দেগীর মধ্যে পাওয়া যেতে পারে। তুমি যদি তাঁর হয়ে যাও, তাহলে তাঁকে পেয়ে যাবে এবং যদি তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরয়ে নাও, তাহলে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হবে।
২১) এ হচ্ছে মর্যাদা লাভ করার আসল উপায়। আল্লাহর কাছে মিথ্যা, কলুষিত ও ক্ষতিকারক কথা কখনো উচ্চ মর্যাদা লাভ করে না। তাঁর কাছে একমাত্র এমন কথা উচ্চ মর্যাদা লাভ করে যা হয় সত্য, পবিত্র-পরিচ্ছন্ন, বাস্তব ভিত্তিক, যার মধ্যে সদিচ্ছা সহকারে একটি ন্যয়নিষ্ঠ আকিদা-বিশ্বাস ও একটি সঠিক চিন্তাধারার প্রতিনিধিত্ব করা হয়েছে। তারপর একটি পবিত্র কথাকে যে জিনিসটি উচ্চ মর্যাদার দিকে নিয়ে যায় সেটি হচ্ছে কথা অনুযায়ী কাজ। যেখানে কথা খুবই পবিত্র কিন্তু কাজ তার বিপরীত সেখানে কথার পবিত্রতা নিস্তেজ ও শক্তিহীন হয়ে পড়ে। কেবলমাত্র মুখে কথার খই ফুটালে কোন কথা উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত হয় না বরং এজন্য সৎকাজের শক্তিমত্তার প্রয়োজন হয়।

এখানে একথাও অনুধাবন করতে হবে যে, কুরআন মজীদ ভালো কথা ও ভালো কাজকে পরস্পরের অবিচ্ছেদ্য ও অপরিহার্য বিষয় হিসেবে পেশ করে। কোন কাজ নিছক ভালো হতে পারে না যতক্ষন না তার পেছনে থাকে ভালো আকীদা-বিশ্বাস। আর কোন ভালো আকীদা-বিশ্বাস এমন অবস্থায় মোটেই নির্ভরযোগ্য হতে পারে না যতক্ষন না মানুষের কাজ তার প্রতি সমর্থন যোগায় এবং তার সত্যতা প্রমাণ করে। কোন ব্যক্তি যদি মুখে বলতে থাকে, আমি এক ও লা-শরীক আল্লাহকে মাবুদ বলে মানি কিন্তু কার্যত সে গাইরুল্লাহর ইবাদাত করে, তাহলে এ কাজ তার কথাকে মিথ্যা প্রমাণিত করে। কোন ব্যক্তি যদি মুখে মদ হারাম বলতে থাকে এবং কার্যত মদ পান করে চলে, তাহলে শুধুমাত্র তার কথা মানুষের দৃষ্টিতেও গৃহীত হতে পারে না, আর আল্লাহর কাছেও তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

২২) অর্থাৎ বাতিল ও ক্ষতিকর কথা নিয়ে এগিয়ে আসে তারপর শঠতা, প্রতারণা ও মনোমুদ্ধকর যুক্তির মাধ্যমে তাকে সামনের দিকে এগিয়ে দেবার চেষ্টা করে এবং তার মোকাবেলায় সত্য ও হক কথাকে ব্যর্থ করার জন্য সবচেয়ে খারাপ ব্যবস্থা আবলম্বন করতেও পিছপা হয় না।
)